Global Header Bottom
অধীনস্থদের প্রতি একজন লাইন ম্যানেজার এবং এরিয়া সেলস ম্যানেজা

অধীনস্থদের প্রতি একজন লাইন ম্যানেজার এবং এরিয়া সেলস ম্যানেজার এর আচরণ যেমন হওয়া প্রয়োজন

পর্ব- ২

অধীনস্থদের প্রতি  একজন লাইন ম্যানেজার   এবং এরিয়া সেলস ম্যানেজার এর   আচরণ যেমন হওয়া প্রয়োজন

টিমের সাফল্যের কৃতিত্ব ভাগ করে নিতে হবে

একজন ভালো নেতা কখনো টিমের সাফল্যকে এককভাবে নিজের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেন না। টার্গেট অর্জিত হলে তিনি বলেন “আমরা করেছি।” কিন্তু সমস্যা হলে তিনি বলেন না “তোমরা পারোনি।” বরং তিনি খুঁজে দেখেন, পরিকল্পনা, নির্দেশনা বা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের কোনো ঘাটতি ছিল কি না। সাফল্যের কৃতিত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং ব্যর্থতার দায়িত্বের অংশ নিজের ওপর নেওয়া একজন শক্তিশালী নেতার পরিচয়।

কঠিন সময়ে অধীনস্থদের পাশে দাঁড়াতে হবে

কর্মীর জীবন শুধু অফিস বা সেলস-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পরিবার আছে, ব্যক্তিগত সমস্যা আছে, অসুস্থতা বা জরুরি পরিস্থিতি থাকতে পারে। ম্যানেজারকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের নীতি মেনে চলতে হবে। কিন্তু বাস্তব মানবিক সমস্যায় যতটা সম্ভব সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। কর্মী যদি অনুভব করেন কঠিন সময়ে তাঁর ম্যানেজার যৌক্তিকভাবে পাশে ছিলেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ও আনুগত্য অনেক বেড়ে যায়। তবে সহানুভূতি এবং শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। মানবিকতা যেন দায়িত্বহীনতাকে উৎসাহিত না করে।

যোগাযোগ স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট হতে হবে

ম্যানেজারের নির্দেশনা অস্পষ্ট হলে কর্মীদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই কোনো কাজ দেওয়ার সময় স্পষ্ট করতে হবে কী করতে হবে, কেন করতে হবে, কখন করতে হবে এবং প্রত্যাশিত ফলাফল কী। টার্গেট এবং কেপিআই সম্পর্কে প্রত্যেক কর্মীর পরিস্কার ধারণা থাকা উচিত। আবার শুধু নির্দেশনা দেওয়া নয়, কর্মী সেটি ঠিকভাবে বুঝেছেন কি না, তাও নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকর যোগাযোগ হলো ভালো ম্যানেজমেন্ট-এর অন্যতম ভিত্তি।

অযথা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়

সেলস প্রফেশনে স্বাভাবিকভাবেই চাপ থাকে। কিন্তু সেই চাপকে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। বারবার হুমকি, অপমান, অপ্রয়োজনীয় ফোন, অসম্ভব প্রতিশ্রুতি আদায় বা অন্যের সঙ্গে অপমানজনক তুলনা কর্মীর মনোবল কমিয়ে দিতে পারে। চাপের পরিবর্তে জবাবদিহিতা তৈরি করতে হবে। কর্মীকে বুঝতে হবে তাঁর একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে এবং সেই দায়িত্বের ফলাফলের জন্য তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি যেন জানেন, সমস্যা হলে তাঁর ম্যানেজার সমাধানে সহযোগিতা করবেন।

তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে

ম্যানেজারের সিদ্ধান্ত আবেগ, রাগ বা ব্যক্তিগত ধারণার ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়। সেলস ডেটা, মার্কেট সিচ্যুয়েশন, প্রিভিয়াস পারফরমেন্স, গ্রোথ, কাভারেজ, কালেকশন এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে একপক্ষের কথা শুনেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রয়োজন হলে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনতে হবে। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ম্যানেজারের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।

নিজেকে উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে

একজন ম্যানেজার অধীনস্থদের কাছে যে আচরণ আশা করেন, প্রথমে তাঁকে নিজেকেই সেই আচরণের উদাহরণ হতে হবে। তিনি যদি সময়ানুবর্তিতা চান, নিজেকেও সময় মতো উপস্থিত হতে হবে। সঠিক রিপোর্টিং চাইলে নিজের রিপোর্টিংও সঠিক হতে হবে। সততা চাইলে নিজের আচরণেও সততা থাকতে হবে। কারণ কর্মীরা ম্যানেজারের নির্দেশনা যতটা অনুসরণ করেন, অনেক সময় তাঁর আচরণ বেশি অনুসরণ করেন। “লিডারশিপ বাই এক্সামপল” দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর নেতৃত্বের একটি পদ্ধতি।

কর্মীর ভবিষ্যৎ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে

একজন ভালো ম্যানেজার শুধু আজকের সেলস দেখেন না; তিনি তাঁর অধীনস্থ কর্মীর ভবিষ্যৎও দেখেন। কর্মী ভবিষ্যতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, টেরিটোরি ম্যানেজার, এরিয়া ম্যানেজার বা আরও উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব নিতে পারেন। তাই তাঁর লিডারশিপ, কমিউনিকেশন, প্ল্যানিং, ডিসিশন মেকিং, প্রবলেম সলভিং স্কিল উন্নয়নে ম্যানেজারের ভূমিকা থাকা উচিত। একজন ম্যানেজারের প্রকৃত লিগ্যাসি হলো তাঁর অধীনে কাজ করে কতজন মানুষ আরও দক্ষ এবং ভালো নেতা হয়ে উঠেছেন।

শৃঙ্খলা ও মানবিকতার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে

ভালো ম্যানেজার হওয়ার অর্থ সবকিছু মেনে নেওয়া নয়। নিয়ম ভঙ্গ, দায়িত্বে অবহেলা, অসততা অথবা বারবার একই ধরনের ভুল হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। তবে সেই ব্যবস্থা হতে হবে প্রতিষ্ঠানের নীতি অনুযায়ী, তথ্যভিত্তিক এবং ন্যায্য। একদিকে অতিরিক্ত কঠোরতা কর্মীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত নমনীয়তা শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে। তাই একজন দক্ষ ম্যানেজারের মধ্যে মানবিকতা এবং দৃঢ়তার সঠিক সমন্বয় থাকা জরুরি।

টিমের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে

একজন এএসএম-এর অধীনে অনেক কর্মী থাকলে তাঁদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে পরিণত না হয়। ম্যানেজারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একজনের সাফল্যে অন্যজন শিখবে, সহযোগিতা করবে এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে। টিমের একজন সদস্য দুর্বল হলে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি না করে কীভাবে উন্নতি করানো যায়, সেটি ভাবা উচিত। কারণ একটি শক্তিশালী টিমে ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সম্মিলিত সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত ফিডব্যাক দিতে হবে

বছরের শেষে শুধু পারফরমেন্স রিভিউ করলেই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ফিডব্যাক দিলে কর্মী দ্রুত নিজের ভুল সংশোধন করতে পারেন। ফিডব্যাক হতে হবে নির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং উন্নয়নমুখী। যেমন শুধু “আপনার কমিউনিকেশন ভালো নয়” বলার পরিবর্তে বলা যায় “কাস্টমার-এর সঙ্গে কথা বলার সময় আপনি প্রোডাক্ট ফিচারস ভালো বলেছেন, কিন্তু কাস্টমার-এর প্রয়োজন বোঝার জন্য আরও কিছু প্রশ্ন করলে কল আরও কার্যকর হবে।” এ ধরনের ফিডব্যাক কর্মীর জন্য বাস্তবে কাজে লাগে।

কর্মীর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে হবে

একজন ম্যানেজারের কথায় একজন কর্মী যেমন অনুপ্রাণিত হতে পারেন, তেমনি ভেঙেও পড়তে পারেন। তাই ম্যানেজারের ভাষার ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। কোনো কর্মী দুর্বল সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে তাঁকে তাঁর আগের ভালো কাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে এবং নতুন করে পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। একজন দক্ষ ম্যানেজার কর্মীকে নির্ভরশীল করে রাখেন না; বরং তাঁর আত্মবিশ্বাস এমনভাবে বৃদ্ধি করেন, যাতে ভবিষ্যতে তিনি নিজেই সমস্যা সমাধান করতে পারেন।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে

ম্যানেজার যদি অধীনস্থকে কোনো বিষয়ে সহযোগিতা, ট্রেনিং, মার্কেট সাপোর্ট বা অন্য কোনো ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে যথাসম্ভব সেটি রক্ষা করা উচিত। বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পালন না করলে কর্মীদের মধ্যে ম্যানেজারের প্রতি আস্থা কমে যায়। আর কোনো কারণে প্রতিশ্রুতি পালন সম্ভব না হলে সেটি পরিস্কারভাবে জানানো উচিত। বিশ্বাসযোগ্যতা নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

সাফল্যের পাশাপাশি শেখার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে

প্রতিটি টার্গেট অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিটি মাস থেকে কী শেখা হলো সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মাস শেষে ম্যানেজার টিমের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন কী ভালো হয়েছে, কোথায় সমস্যা হয়েছে, কোন স্ট্র্যাটেজি কাজ করেছে, কোনটি করেনি এবং আগামী মাসে কী পরিবর্তন করা দরকার। এভাবে ধীরে ধীরে একটি লার্নিং কালচার তৈরি হয়। যে টিম ভুল থেকে শেখে, সেই টিম ভবিষ্যতে একই ভুল কম করে এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। একজন লাইন ম্যানেজার বা এরিয়া সেলস ম্যানেজারের দায়িত্ব শুধু টার্গেট নির্ধারণ, সেলস রিপোর্ট দেখা কিংবা অধীনস্থদের কাজ পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মূলত একটি টিমের নেতা এবং সেই টিমের সদস্যদের পেশাগত বিকাশের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক।

একজন আদর্শ ম্যানেজার তাঁর অধীনস্থদের সম্মান করবেন, তাঁদের কথা শুনবেন, ভালো কাজের স্বীকৃতি দেবেন, ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ দেবেন এবং প্রয়োজনীয় ট্রেনিং এবং কোচিং প্রদান করবেন। একই সঙ্গে তিনি টার্গেট, ডিসিপ্লিন, অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি এবং পারফরম্যান্স-এর ক্ষেত্রে দৃঢ় থাকবেন। তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যেখানে কর্মীরা ম্যানেজারকে ভয় পেয়ে সত্য গোপন করবেন না; বরং বিশ্বাসের সঙ্গে সমস্যা জানাবেন এবং সমাধান চাইবেন। তিনি পক্ষপাতিত্ব করবেন না, ব্যক্তিগত আক্রমণ করবেন না এবং কর্মীর আত্মসম্মান বিলীন করে ফলাফল আদায়ের চেষ্টা করবেন না।

একজন ম্যানেজারকে মনে রাখতে হবে একজন কর্মী শুধু একটি এ্যামপ্লয়ী আইডি বা সেলস নাম্বার নন। তিনি একজন মানুষ, যার সম্মান, আবেগ, পরিবার, স্বপ্ন এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ রয়েছে। এই মানবিক উপলব্ধির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও শৃঙ্খলার সমন্বয় করতে পারাই প্রকৃত নেতৃত্ব। ম্যানেজার যদি শুধু ভয় ও চাপ দিয়ে কাজ করান, তাহলে হয়তো স্বল্প সময়ের জন্য কিছু ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী, বিশ্বস্ত ও আত্মনির্ভরশীল টিম তৈরি করতে হলে প্রয়োজন সম্মান, বিশ্বাস, প্রশিক্ষণ, ন্যায্যতা, জবাবদিহিতা এবং অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব। সুতরাং একজন সফল লাইন ম্যানেজার বা এরিয়া সেলস ম্যানেজারের দর্শন হওয়া উচিত “চাপ নয় সঠিক দিকনির্দেশনা। অপমান নয় সম্মানের সঙ্গে সংশোধন। ভয় নয় বিশ্বাস ও জবাবদিহিতা। পক্ষপাত নয় ন্যায্য মূল্যায়ন। শুধু নির্দেশ নয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা। একার কৃতিত্ব নয় পুরো টিমের সাফল্য।”

সবশেষে বলা যায়, একজন সাধারণ ম্যানেজার মানুষের কাছ থেকে কাজ আদায় করেন, কিন্তু একজন অসাধারণ ম্যানেজার মানুষকে কাজ করার যোগ্য, আগ্রহী ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলেন। প্রকৃত নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু আজকের টার্গেট অর্জন নয়; বরং এমন একটি দক্ষ, সুশৃঙ্খল, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল টিম তৈরি করা, যারা ম্যানেজারের অনুপস্থিতিতেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে আন্তরিকভাবে কাজ করতে পারে।

(সমাপ্ত)

জেনারেল ম্যানেজার, এসিআই, পিএলসি

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer