কেন আমাদের চা শতভাগ অর্গানিক দাবী করি
পঞ্চগড়ে “কাজী অ্যান্ড কাজী টি” চা উৎপাদনের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষের শত শত বছরের ধারণা পাল্টে দিয়েছে। আমাদের কোম্পানি চা উৎপাদনের পূর্ব পর্যন্ত এদেশের মানুষের ধারণা ছিল সিলেট এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশই শুধু চা উৎপাদনের জন্য উপযোগী। কিন্তু না, আমরা সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছি। এটা ছিল আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান স্যারের ব্রেইন চাইন্ড আইডিয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন নিচু জমিতেও চা চাষ করা সম্ভব। এখন আমাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর স্যার সেই বিজনেসকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
কীটনাশক ব্যবহার না করলেই কী অর্গানিক হয়
আমাদের অনেকের মধ্যেই অর্গানিক ধারণা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি কাজ করে। বিষয়টি আমি সহজে ব্যাখ্যা করি। মনে করুন আপনি আপনার জমিতে শশা উৎপাদনের পরিকল্পনা করলেন। জমিতে আপনি কোনো প্রকার রাসায়নিক কীটনাশক, সার, বা কেমিক্যাল ব্যবহার করলেন না। আপনি মনে করতে পারেন এই শশা অর্গানিক। আসলে এটা অর্গানিক না। কারণ, আপনি কীটনাশক ব্যবহার করেননি। কিন্তু এই জমিতে আগে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। আপনি যে বীজ ব্যবহার করেছেন সেটা অর্গানিক না। আপনি যে সার দিয়েছেন সেটাও হয়তো অর্গানিক না। তাহলে আপনার শশা কীভাবে অর্গানিক হবে। এখানেই অন্যান্য চায়ের সাথে আমাদের পার্থক্য। কারণ, শতভাগ অর্গানিক হওয়ার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তার সবকিছুই আমরা করি।
আমরা কেন শতভাগ অর্গানিক দাবী করি
আমরা চা চাষের জন্য তিন থেকে চার বছর সময় নিয়ে প্রথমে জমি প্রস্তুত করেছি। ধাপে ধাপে পুরো জমিকে অর্গানিক করেছি। বীজ থেকে চারা উৎপাদন করেছি। ওই চারার তিন প্রজন্ম পার হওয়ার পর যে চারা পেয়েছি ওই চারা ছিল পুরো অর্গানিক। এরপর ওই চারা জমিতে রোপন করেছি। আমরা কখনো কোনো কীটনাশক বা রাসায়নিক সার জমিতে ব্যবহার করি না। সার হিসেবে আমরা গরুর গোবর ব্যবহার করি। এখানেও রয়েছে আমাদের ভিন্নধর্মী পরিকল্পনা। আমরা গোবর সংগ্রহের জন্য এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার গরু ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছি। আমরা প্রত্যেক পরিবারকে একটি গাভী এবং একটি বাছুর দিয়েছি। এই গাভী এবং বাছুরের জন্য তাঁদেরকে কোনো নগদ অর্থ প্রদান করতে হয় না। তাঁরা প্রতিদিন গোবর এবং দুধ দিয়ে এই মূল্য পরিশোধ করেন। গরুকে কোনো রাসায়নিক ফিড খাওয়ানো হয় না। ফিড দিলে গোবর অর্গানিক হবে না। আমাদের নিজস্ব গরুর খামার রয়েছে। ওখানে প্রায় এক হাজার গরু আছে। গরুগুলোকে চার ধরনের ঘাস খাওয়ানো হয়। বাগানে কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। বাগানে প্রায় দেড়শ প্রজাতির ওষুধি গাছ রয়েছে। নিম পাতা সহ আরও কয়েকটি গাছের পাতা তেতো স্বাদের। এগুলো দিয়ে স্প্রে তৈরি করা হয়। বাগানে যখন পোকা-মাকড় আসার সময় হয় তখন আমরা স্প্রে করি।
ফলে কোনো পোকামাকড় মরে না। ক্ষতিকর পোকামাকড় পালিয়ে যায়। এ কারণে আমাদের বাগানে সব সময় ঘাস দেখা যায়। বাগানে প্রচুর পাখির সমাগম ঘটে। ভারত থেকেও প্রচুর পাখি আসে। পঞ্চগড়ে বর্তমানে ৩৩টি বাগান রয়েছে। একমাত্র আমাদের বাগানে ঘাস দেখা যায়। পাখির কলরব শোনা যায়। আমাদের চা গাছের পাতাগুলো ঝকঝকে হয় না। কারণ এখানে কোনো কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। অন্যান্য বাগানের পাতাগুলো দেখতে আমাদের পাতার চেয়ে সুন্দর। আমাদের চায়ের মধ্যে অনেকগুলো ভ্যারিয়েন্ট আছে। আমাদের চায়ের মধ্যে আদা, তুলসি পাতা সহ আরও উপাদান রয়েছে। এগুলোও আমরা অর্গানিক উপায়ে চাষ করি। কারণ, চায়ের পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো একটি জায়গায় রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি থাকলে সেটাকে আর অর্গানিক বলা যাবে না। নিম গাছ, সজনে গাছ আমাদের বাগানে শেড ট্রি হিসেবে ব্যবহার করছি। আমাদের বাগানের প্রতিটি কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারে এবং সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতার সাথে করা হয়। ফলে এখানে অর্গানিক না হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই জায়গায় আমরা কমিটেড। আমরা আমাদের ক্রেতা, ভোক্তা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহ সকলের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই জায়গায় আপোষ করার কোনো সুযোগ নেই।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা
আমাদের দেশ সহ পুরো বিশে^র মানুষের কাছে দার্জিলিং চা সুপরিচিত। যাঁরা চা পছন্দ করেন তাঁদের প্রায় সকলেই এই চায়ের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো দার্জিলিং ভারতের একটি জায়গার নাম। ওই জায়গাটিকে ভারত এমনভাবে ব্র্যান্ডিং করেছে, এখন ওই জায়গার যেকোনো চা-ই দার্জিলিং চা নামে পরিচিত। ক্রেতারা কোনো বিশেষ ব্র্যান্ডের নাম ধরে চা খোঁজেন না। তাঁরা খোঁজেন দার্জিলিংয়ের চা। অনুরূপভাবে আমাদের সরকার যদি পঞ্চগড়ের চায়ের গুরুত্ব অনুধাবণ করে এই জায়গাটিকে ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে আমাদের এই অঞ্চলের চা বিশ^ব্যাপি সমাদৃত হতে পারে। দেশে এবং বিদেশে এই চায়ের সুনামও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এখানে একটি কথা আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি পঞ্চগড়ের চা আন্তর্জাতিক মানের। তবে সেটা অবশ্যই পুরো অর্গানিক হতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টি-বোর্ড থেকে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। চায়ের গুণগতমান সম্পর্কিত বিভিন্ন দেশ থেকে সার্টিফিকেট অর্জন করেছি। ফলে পঞ্চগড়ে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চা উৎপাদন সম্ভব এটা প্রমাণীত। এখন প্রয়োজন বিশ^বাজারে এই জায়গার ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা। আর এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
চীফ অপারেটিং অফিসার, কাজী অ্যান্ড কাজী টি