Global Header Bottom
লিডারশিপ জন্মগত নয়, তৈরি করতে হয়

লিডারশিপ জন্মগত নয়, তৈরি করতে হয়

লিডারশিপ জন্মগত নয়, তৈরি করতে হয়

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি লিডারশিপ জন্মগতভাবে তৈরি হয়। কিন্তু আমি যখন কানাডার ক্যালগেরি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গেলাম তখন সেখানে আমার সুযোগ হয়েছিল লিডারশিপ এবং অর্গানাইজেশনাল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে পড়ালেখা করার। সেখানে অধ্যয়ন করার সময় বুঝতে পারলাম লিডারশিপ তৈরি করতে হয়। কারণ লিডারশিপের জন্য যে উপাদানগুলো প্রয়োজন, যে বৈশিষ্ট্যগুলো প্রয়োজন এগুলো ধীরে ধীরে একজন লিডারকে রপ্ত করতে হয়। এগুলো আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। অর্থাৎ রাতারাতি কারও মধ্যে লিডারশিপ প্রবেশ করিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। সৃষ্টির শুরুর দিকে লিডারশিপ অনেকটা জন্মগত ছিল। ওই সময় বাবার পরে তাঁর ছেলেই লিডারশিপ পেত।

তখনকার জীবনধারা, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট সবকিছু মিলিয়ে ওটাই ছিল মানানসই। কিন্তু এখন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য একজন লিডারকে যে ধরনের কোয়ালিটি, কম্পিটেন্সি, ইন্টেলেকচুয়াল নলেজ ধারণ করতে হয় তা জন্মগতভাবে পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয় লিডার তৈরি করতে হয়, লিডারশিপ তৈরি করতে হয়। এ কারণে পৃথিবীর প্রায় সকল ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লিডারশিপের ওপরে উচ্চতর ডিগ্রি দিচ্ছে। এমনকি পিএইচডি ডিগ্রীও প্রদান করছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে লিডারশিপ নিয়ে অবিরাম গবেষণা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লিডারশিপের ওপর কোর্স রয়েছে, গবেষণা রয়েছে। এ থেকেও প্রমাণিত হয় লিডারশিপ পড়তে হয়, জানতে হয়, শিখতে হয়।

লিডারশিপ দু’ভাবে তৈরি হতে পারে। যেমন কোনো দেশের সরকার প্রধান কোনো কাজের জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেন। এই উপদেষ্টা তাঁর নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লিডারের ভূমিকা পালন করেন। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে লিডারশিপ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার মনে করলে তাঁর লিডারশিপ যেকোনো সময় বাতিল করতে পারেন। আরেক ধরনের লিডারশিপ পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তৈরি হয়। এটা হতে পারে সামাজিক আন্দোলনে কেউ একজন নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিংবা হতে পারে প্রতিষ্ঠানে কেউ একটি ডিপার্টমেন্টকে বা পুরো প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উভয় ক্ষেত্রে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিডারশিপের আসনে বসেছেন। তাঁরা কেউ আকস্মিকভাবে লিডার হননি। ফলে তাঁদেরকে ইচ্ছে করলেই যখন তখন বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। একটা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পর্যায়ে যিনি দায়িত্ব পালন করেন প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরনের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি যদি পুরো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকেন তাহলে দেখা যাবে তাঁর অতীত কর্মজীবন তাঁকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে।

একজন লিডারকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়। তাঁর মধ্যে কিছু ক্যারিশমেটিক গুণাবলী থাকা প্রয়োজন যা তাঁকে অন্যদের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কমিউনিকেশন স্কিল, আইটি নলেজ, বিষয়বস্তুকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, অসীম ধৈর্য, জটিল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, জবাবদিহিতা, সাম্যতা, স্বচ্ছতা, সততা, সাহস এর মতো বিষয়গুলো একজন ব্যক্তির মধ্যে না থাকলে তাঁর পক্ষে সত্যিকার অর্থে ভালো লিডার হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর লিডারশিপে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

যাঁরা লিডারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন বা এই বিষয় নিয়ে যথেষ্ট পড়ালেখা করেন তাঁদের লিডারশিপের ধরন হয় একরকম। কারণ তাঁদের শেখানো হয় কোন ক্ষেত্রে কোন ধরনের আচরণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাজের প্রতি শতভাগ উদ্দীপ্ত করবে। আর কোন ধরনের আচরণ কাজের প্রতি কর্মীদের মনোভাব নেতিবাচক করে তুলবে। ফলে একজন লিডারের মধ্যে যখন এই জ্ঞানগুলো থাকে তখন তিনি ইচ্ছে করলেও অন্য ধরনের আচরণ করতে পারেন না। তিনি প্রতিক্ষণ তাঁর অর্জিত জ্ঞান দ্বারা অদৃশ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত হন। কিন্তু লিডারশিপের ওপর কেউ যদি পড়ালেখা না করে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে তাঁকে সব সময় অনুমান নির্ভর হয়ে কাজ করতে হবে। এটা সব সময় লিডারকে সফলতা দেবে না।

বাংলাদেশে লিডারশিপ সম্পর্কে এখনো ভ্রান্ত ধারণা কাজ করছে। এ কারণে পারিবারিক ব্যবসাগুলোতে বাবার পর ছেলে বা মেয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। কখনো এমডি হিসেবে, কখনো ডিএমডি হিসেবে, আবার কখনো ডিরেক্টর হিসেবে। ফলে আমাদের দেশের বড় বড় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রথম প্রজন্ম দ্বারা ভালোভাবে, সফলতার সাথে পরিচালিত হলেও দ্বিতীয় প্রজন্ম যখন দায়িত্ব নিচ্ছেন তারপর থেকেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। অথচ দ্বিতীয় এবং তৃতীয় প্রজন্মের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি।

প্রথম প্রজন্ম অর্থাৎ বাবার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা ছিল বলেই তিনি প্রতিষ্ঠানকে বড় থেকে আরও বড় করতে পেরেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার হয়তো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা, সবকিছুই তাঁকে সফলতার দিকে ধাবিত করেছে। তাছাড়া আমাদের দেশের ব্যবসয় জগত আগে অনেকটা ফাঁকা ছিল। তখন যে ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল সেটা প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন, প্রতিযোগিতা তীব্র। ফলে এখনকার নেতৃত্ব আরও শানিত, আরও কৌশলগত হওয়া প্রয়োজন। আর তার জন্য লিডারকে অনেক বেশি জানতে হবে, শিখতে হবে, পড়তে হবে।

লেখার বিষয়বস্তু একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত।

এইচআর অ্যাডভাইজার, আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রিসোর্স অর্গানাইজেশনস প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট এইচআর অ্যাডভাইজার, আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রিসোর্স অর্গানাইজেশনস প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer