পর্ব- ২
আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?
আমাদের দেশের বিভিন্ন পণ্য বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এফএমসিজি, ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য নিয়মিতভাবেই রপ্তানি হচ্ছে। তৈরি পোশাকের সাথে এই পণ্যগুলো রপ্তানির একটা মৌলিক পার্থক্য হলো তৈরি পোশাক আমরা বিদেশি ব্র্যান্ডের নামে তৈরি করে রপ্তানি করছি। কিন্তু এফএমসিজি, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, ফার্নিচার সহ আরও অনেক পণ্য আমরা রপ্তানি করছি আমাদের দেশের বিভিন্ন কোম্পানির ব্র্যান্ড নামে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড রয়েছে যাদের পণ্য পৃথিবীর অনেকগুলো দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় এগুলো আমাদের গ্লোবাল ব্র্যান্ড বা ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড। গত সংখ্যায় উল্লেখ করেছিলাম বিদেশে আমাদের দেশি ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রির অন্যতম একটি কারণ হলো আমাদের দেশের মানুষের বিদেশে বসবাস। এদেশের মানুষ কোন দেশে কি পরিমাণে বসবাস করছেন সেটা নির্ণয় করা কঠিন কোনো কাজ নয়।
একটি কোম্পানি যখন বুঝতে পারে কোনো একটি দেশে আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস করছেন তখন ওই কোম্পানি কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করে ওই দেশে পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করে। এভাবে আমাদের দেশের অনেক পণ্যই পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এফএমসিজি ক্যাটাগরির পণ্যগুলো এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। সেই তুলনায় ইলেকট্রিক্যাল বা ইলেকট্রনিক্স পণ্য সেভাবে বাজার দখল করতে পারেনি। এর মূল কারণ হলো এক প্যাকেট মসলা বা চানাচুর, বিস্কুট যে দামে কেনা যায়, যতটা সহজে কেনা যায়, একটি ফ্রিজ বা টেলিভিশন অথবা এসি অত সহজে কেনা যায় না। দামের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। ফলে প্রবাসীরা যে দেশে অবস্থান করছেন ওই দেশে অন্য কোনো ব্র্যান্ড কেনার কথা চিন্তা করেন। এছাড়া আমাদের দেশের খাদ্যপণ্যের স্বাদ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের খাদ্যপণ্যের স্বাদের সাথে মেলেনা। ফলে মসলা, চানাচুর, বিস্কুট, বা অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী যতটা সহজে প্রবাসীরা গ্রহণ করেন অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করেন না। বরং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপে বসবাসকারী প্রবাসীরা ওই সকল দেশের ব্র্যান্ডের প্রতি বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেকে অন্য যে দেশের ব্র্যান্ড অতি পরিচিত সে দেশেরটা বেছে নেন।
মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য কোনো দেশে আমাদের দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য সুবিধা করতে না পারার বড় কারণ হলো পুরো পৃথিবীতে চীনের পণ্যের জয়জয়কার অবস্থা। প্রাইস বেনিফিট চীনের কোম্পানিগুলো যেভাবে দিতে পারে সেটা আমাদের দেশের কোনো কোম্পানির পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ইলেকট্রিক্যাল বা ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যগুলো চীন থেকে আমদানি করা খুচরা যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে। আমরা এখানে শুধু সংযোজনের কাজ করছি। এক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে, যে পণ্য চীন থেকে কোনো দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে ওই পণ্যের যন্ত্রাংশ আমাদের দেশে আমদানি করে পুনরায় ওই একই পণ্য যে দেশে চীন রপ্তানি করছে ওই দেশে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা সম্ভব কিনা। স্বাভাবিকভাবেই উত্তর আসবে সম্ভব না। এ কারণে কনজ্যুমার গুডস বিশেষ করে এফএমসিজি ক্যাটাগরির পণ্যে রপ্তানি বাজারে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো যে ধরনের বিক্রির পরিমাণ দেখাতে পারে ইলেকট্রনিক্স বা ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের বেলায় সেটা সম্ভব নয়। এ কারণে এ ধরনের পণ্য নিয়ে আমাদের পক্ষে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
গত সংখ্যায় উল্লেখ করেছিলাম গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার জন্য মাইন্ডসেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমি লন্ডন, নিউইয়র্ক গিয়েছি। ওখানে ইন্ডিয়ার কয়েকটি ব্র্যান্ডের মসলা দেখেছি। ওরা ওদের প্রোডাক্ট নিয়ে লোকাল মার্কেট অপেক্ষা গ্লোবাল মার্কেট নিয়ে বেশি চিন্তা করে। ওদের পণ্যের মান আমাদের চেয়ে বিশেষ কিছু না। যদি আমাদের পণ্য রপ্তানিযোগ্য না হতো তাহলে বিদেশের বাজারে বিক্রি হতো না। এ কথা সত্য, আমাদের পণ্য প্রবাসী ভাই-বোনেরা কিনছেন। কিন্তু মান বিবেচনায় খারাপ নয়। খারাপ হলে ওই সকল দেশে প্রবেশের অনুমতি পেত না। আমি আমাদের দেশের রাঁধুনী ব্র্যান্ড নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু এই ব্র্যান্ডটিকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে নড়েচড়ে বসতে দেখিনা। প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব একটি মার্কেটিং প্ল্যান থাকে, মার্কেটিং স্ট্রাটেজি থাকে। হয়তো এই কোম্পানি গ্লোবালি ফোকাস হতে চায় না। অথবা লোকাল মার্কেটে মার্কেট শেয়ার বড় করার প্রতি অধিক মনোযোগী। এ কারণে গ্লোবাল মার্কেট নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না। কিন্তু আমি মনে করি রাঁধুনী যদি গ্লোবাল মার্কেটের জন্য খুব স্ট্রংলি চিন্তাভাবনা করত তাহলে এটি ধীরে ধীরে একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত।
আমি এখানে আবারো বলব, গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার জন্য মাইন্ডসেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিদেশে আমাদের এমনও ব্র্যান্ডের মসলা পাওয়া যায় যেগুলো এদেশের মানুষ চিনেও না। তার অর্থ এই নয় ওইগুলো অখ্যাত ব্র্যান্ড এবং গুণগতমানে খারাপ। আসলে ওই ব্র্যান্ডগুলো তৈরি হয়েছে বিদেশের বাজারে বিক্রি করার জন্য। ওই ব্র্যান্ডগুলোর শুরু থেকেই মাইন্ডসেট ছিল বিদেশের বাজারে মসলা বিক্রি করবে। যে সকল দেশে মসলা বিক্রি করতে চেয়েছে ওই সকল দেশের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে চিন্তা করেছে। মসলা ওই সকল দেশে রপ্তানি করতে হলে কোন কোন ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে হবে তা বিবেচনা করেছে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। অতঃপর গাইডলাইন অনুযায়ী মসলা প্রস্তুত করে রপ্তানি করছে। এই যে মাইন্ডসেট একটি ব্র্যান্ডকে গ্লোবালি চিন্তা করতে গেলে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। আমার মনে হয় রাঁধুনী এই জায়গাটিতে আটকে আছে। একটি ব্র্যান্ডকে গ্লোবাল ব্র্যান্ডে রূপান্তর করতে হলে সবার আগে মাইন্ডসেট ঠিক করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমি বলব শুধু রাঁধুনী নয়, বরং আমাদের দেশের অনেক কোম্পাানি এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না।
মার্কেটিং কনসালট্যান্ট