ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং: আমার যত অভিজ্ঞতা
সিটি থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে
সিটি ব্যাংকের “মেকিং সেন্স অব মানি” এই কাজটি ওই সময়ে ব্যাংক পাড়ায় বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। আমি বলবো কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে ওটা ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি মাইলফলক। এরপরেই আমি ডাক পাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে। তখন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক পুরো বিশ^ জুড়েই ট্রান্সফরমেশনের একটি প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছিল। আমি ওখানে জয়েন করি কান্ট্রি মার্কেটিং হেড, বাংলাদেশ হিসেবে। “হেয়ার ফর গুড” এটিই ছিল ওই ট্রান্সফরমেশনের মূল কথা। “হেয়ার ফর গুড” কনসেপ্টকে বিবেচনায় নিয়ে তখন ব্রাঞ্চ থেকে শুরু করে ইন্টেরিয়র এবং কমিউনিকেশনের অন্যান্য টুলসগুলোর মধ্যে পরিবর্তন এনেছিলাম। এই পরিবর্তন ছিল ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনে, এই পরিবর্তন ছিল ভার্বাল কমিউনিকেশনে। আমরা সকল প্রিন্টেড ম্যাটেরিয়ালস এর মধ্যেও পরিবর্তন এনেছিলাম। তবে আমরা সব সময় মাথায় রেখেছি কোনো পরিবর্তন যেন ব্র্যান্ড ফিলোসোফি, ব্র্যান্ড ভ্যালুজ এবং ব্র্যান্ড ইমেজের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ওই প্রোগ্রামটিতে একটি বিষয় উল্লেখ ছিল, পুরো বিশ^ জুড়ে কার্যক্রমটি চললেও কান্ট্রি স্পেসিফিক হতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি দেশে কার্যক্রম চলার সময় ওই দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন পণ্যসামগ্রির প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। ফলে আমরা তখন আমাদের জামদানি, নকসী কাঁথা এবং কাঁশফুলকে কমিউনিকেশনে যুক্ত করেছিলাম। কেউ যদি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হেড অফিসে যায় তাহলে ওই মোটিভ এখনো খুঁজে পাওয়া যাবে। আবার আমরা কমিউনিকেশনে যাঁদেরকে মডেল হিসেবে নিয়েছিলাম সেখানেও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের টার্গেট গ্রুপের সাথে মানিয়ে যায় এমন মডেলদের বাছাই করেছিলাম। কারণ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে যাঁরা লেনদেন করেন তাঁদের সাথে যদি মডেলকে মানানসই মনে না হয় তাহলে সেটা অনেক গ্রাহকের মনকে আঘাত করতে পারে। বাংলাদেশে অনেক কমিউনিকেশনেই এই বিষয়টির বেশ ঘাটতি দেখি। কিন্তু আমরা ওখানে কাজ করার সময় প্রতিটি কাজে মুন্সিয়ানা দেখানোর চেষ্টা করেছি। যাঁদের জন্য কমিউনিকেশন তাঁরা যদি সেখানে তাঁদের মতো ফেসগুলো দেখেন তাহলে তাঁরা এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করেন। আমরা আমাদের টার্গেট গ্রুপকে ওই প্রশান্তিটাই দিয়ে চেয়েছিলাম। অপ্রিয় হলেও সত্য, ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনে এই জায়গাটি অনেকেই মিস করেন।
বাংলাদেশে অনেকেই মার্কেটিং নিয়ে কাজ করছেন, ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করছেন। তাঁরা মার্কেটিং নিয়ে অনেক পড়াশোনাও করছেন। কিন্তু তারপরেও ভিজ্যুয়ালি একটি কমিউনিকেশনের আদলটা কেমন হওয়া উচিত সেটা শেষ পর্যন্ত ঠিক করতে পারেন না। ফলে দেখা যায় টার্গেট গ্রুপের ওপর ওই কমিউনিকেশন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। আমাকে যখন কোনো গ্লোবাল ব্র্যান্ড তাদের কমিউনিকেশনে কান্ট্রি স্পেসিফিক এর কথা বলবে তখন ব্র্যান্ডের মূল থিম ঠিক রেখে আমাকে স্থানীয় বিভিন্ন পণ্যসামগ্রি ব্যবহার করতে হবে। সেখানে অন্যকিছু ভাবার সুযোগ নেই। প্রায়োরিটি ব্যাংকিং হলো হাই ভ্যালু সেগমেন্টের একটি প্রোডাক্ট। এ ধরনের প্রোডাক্টের যে ধরনের কাস্টোমার হয় তাঁদের আদল বিবেচনা করেই আমরা মডেল হায়ার করেছিলাম। আমাদের টার্গেট গ্রুপ যে ধরনের পোশাক পরেন, যে ভাষায় কথা বলেন, যে ধরনের পরিবেশে থাকেন এই সবই বিবেচনা করে কমিউনিকেশনগুলো করার চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাজের এলিট শ্রেণির লোকদের হায়ার করেছি কমিউনিকেশনে মডেল হওয়ার জন্য। ফলে সবকিছুকে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি মনে হতো। টার্গেট গ্রুপ কমিউনিকেশনে তাঁরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতেন। আমরা যদি এই কাজটি না করে কোনো বিদেশির ছবি বা বিদেশিকে মডেল হিসেবে বাছাই করতাম তাহলে সেটা কিন্তু আমার টার্গেট গ্রুপের সাথে কানেক্ট করতে পারতো না। অনেকেই জেনে বা না জেনে কিংবা বুঝে বা না বুঝে এই ধরনের ভুলগুলো করে থাকেন।
কোনো দেশ যদি ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনে চেরিফুলের ছবি ব্যবহার করে তাহলে বুঝতে হবে ওই ফুল ওই দেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। চেরিফুলের ছবি দেখে যদি আমি মনে করি ফুলটি দেখতে বেশ সুন্দর, এবং আমিও এটাই ব্যবহার করি তাহলে তো আর কান্ট্রি স্পেসিফিকেশন হলো না। আমাকে আমার দেশের পণ্যসামগ্রির ছবি ব্যবহার করতে হবে। আর এ কারণেই আমরা কাঁশফুলকে বেছে নিয়েছিলাম।
(চলবে)
আফতাব মাহমুদ খুরশিদ কর্পোরেট জগতে অতি পরিচিত নাম| অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ব্র্যান্ড ক্যাটালিস্ট হিসেবে| ২০০৭ সালে তিনি পেয়েছেন ব্র্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন| অতপর যুক্তরাজ্য থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ| দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর| স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিমেন্স, এসিআই, বাংলালায়ন, রেডিও টুডে, প্রাইড, ট্রাস্ট ব্যাংক, বেঙ্গল গ্রুপ, অ্যাপোলো হাসপাতাল, এসএসজি, সিটি ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন| এছাড়া দেশে-বিদেশে ব্র্যান্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদান করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন|