পর্ব- ২
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ইন্ডাস্টি: বিশ্বব্যাপী চাকরির সুযোগ
আমি কর্মজীবন শুরু করেছিলাম ১৯৮২ সালে| প্রথমে কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল| তারপর জাতিসংঘে| কেয়ারে যখন ছিলাম তখন প্রায়ই একটি কথা আমরা শুনতাম ‘কর্মীর চাকরি যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রতিষ্ঠানেরও কর্মী প্রয়োজন’| ওই সময়ে শুনে আসার সেই কথার প্রতিধ্বনি এখন প্রতিনিয়ত শুনছি| কর্মী ছাড়া কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চলা সম্ভব না| কিন্তু সেই কর্মীকে হতে হবে যোগ্যতাসম্পন্ন| কর্মী যদি যোগ্যতাসম্পন্ন না হয় তাহলে ওই কর্মী প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে আসবে না| বরং হিতেবিপরীত হবে| অর্থাৎ লাভের লাভ তো হবেই না, বরং ওই কর্মীর কারণে প্রতিষ্ঠানকে যারপরনাই লোকসান গুণতে হতে পারে| আমরা বোধকরি সেই রকম একটা সময়ই পার করছি| চারিদিকে লোকের সমাগম| শিক্ষিত বেকারের তালিকা অনেক ল¤^া| কিন্তু কাজের লোক পাওয়া যায় না| আমরা যাঁরা ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করছি তাঁরা এই শূন্যতা প্রতিনিয়ত অনুভব করছি| আমাদের লোক প্রয়োজন| কিন্তু যে দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোক প্রয়োজন তা পাচ্ছি না| ফলে প্রয়োজনীয় লোকের সংখ্যার সাথে ইন্ডাস্ট্রিতে সরবরাহকৃত লোকের সংখ্যার মধ্যে বেশ ফারাক রয়ে যাচ্ছে|
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি এমন একটি ইন্ডাস্ট্রি যেখানে দেশে বিদেশে চাকরির অবারিত সুযোগ রয়েছে| আমরা যদি আমাদের দেশের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে এখানে এখন অনেক নামীদামী হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট রয়েছে| আগামীতে আরও হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট আসবে| কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল নেই| বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় বর্তমানে এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের চাকরির সুযোগ রয়েছে| আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে| কিন্তু ওই পদের বিপরীতে কর্মী তৈরি হবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন|
এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে অনেকের একটি ধারণা রয়েছে যাঁরা ট্যুরিজম অ্যান্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়ালেখা করছে বা করবে তাঁদের শুধু হোটেলেই চাকরি করতে হবে| আর বাংলাদেশে যেহেতু অনেক বেশি হোটেল নেই সেহেতু এখানে ক্যারিয়ার ডেভেলপ করা কঠিন| কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁদের এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল| কারণ, এই ইন্ডাস্ট্রির ব্যাকওয়ার্ড এবং ফরোয়ার্ড লিংকেজ অনেক বড়| এ কারণে এখানে চাকরির সুযোগ অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত| এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন এই বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করলে শুধু দেশে নয়, বরং দেশের বাইরেও প্রচুর চাকরির সুযোগ রয়েছে| এমনকি অনেক দেশ এ ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে|
আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি ফাইভ স্টার মানের হোটেল রয়েছে| পাশাপাশি রয়েছে চেইন হোটেল| প্রতিটি চেইন হোটেলের জিএম পদগুলো বিদেশিদের দ্বারা পূরণ করতে হচ্ছে| কারণ এই পদগুলোতে আমাদের দেশের যোগ্য কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না| অথচ এই পদগুলোতে যদি আমাদের দেশের লোক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হতো তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদের ব্র্যান্ডিং আরও ভালো হতো| সারা বিশে^র হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো তখন এদেশ থেকে হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের জন্য লোক নিয়োগ করতো|
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের ওপর ডিগ্রি নেওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী ইচ্ছে করলে অনেকগুলো দিকে ক্যারিয়ার ডেভেলপ করতে পারে| যেমন হোটেল-রেস্টুরেন্ট-রিসোর্ট ম্যানেজমেন্ট, পাবলিক হাউজেস, কনফারেন্স হল, অ্যাকোমোডেশন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং সার্ভিসেস, কাস্টমার সার্ভিসেস, এয়ারলাইন্স, ক্রুজার, হসপিটালস, ট্রান্সপোর্টেশন, স্পা অ্যান্ড বিউটি পার্লার, ডেসটিনেশন প্ল্যানিং, গাইড, স্পোর্টস, এন্টারটেইনমেন্ট, স্পোর্টস অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টার, সিনেমা, থিয়েটার, থিমপার্ক, ক্যাসিনো, মেগা শপিং মল, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্রাভেল কনসালটেন্সি, ট্যুর ম্যানেজার, ট্রান্সশিলেটর| এছাড়া একজন শিক্ষার্থী এই সেক্টরগুলোতে চাকরির চেষ্টা না করে এগুলোর মধ্যে যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে নিজেই ব্যবসা করার চিন্তা করতে পারে| তবে এক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখতে হবে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে শুধু ডিগ্রি নিলে হবে না বা শুধু সার্টিফিকেট পেলেই চলবে না| বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে| শিক্ষার্থীদের একটি কথা মনে রাখতে হবে শুধু সিজিপিএ বা কোনো ডিগ্রি চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না| ওটা শুধু চাকরির আবেদন করার যোগ্যতা| চাকরি পেতে হলে সার্টিফিকেটে উল্লেখিত বিষয় সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান রাখতে হবে| ভাষা ভাষা জ্ঞান নয়| গভীর থেকে জ্ঞান| তাহলেই ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের পথটি সুগম হবে|
(চলবে)
“ড. মারুফ উল ইসলাম বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী| ছেলেবেলা কেটেছে জন্মস্থান খুলনায়| পড়ালেখা ব্যবসায় অনুষদে| অর্জন করেছেন সর্বোচ্চ ডিগ্রি| বিদেশী প্রতিষ্ঠানে চাকরির ¯^প্ন ছাত্রজীবন থেকে| ১৯৮২ সালে কর্মজীবন শুরু| প্রথমে কেয়ার ইন্টারন্যাশনালে| তারপর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামে| প্রথমে দেশে অতপর ওমান, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফগানিস্তান, রোয়ান্ডা, কঙ্গো, সুদান| ঘুরতে হয়েছে আরও অনেক দেশ| যেখানে যুদ্ধ সেখানেই ছুটে গিয়েছেন মানবিক সাহায্য নিয়ে| চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন| তবে থেমে নেই পথচলা| বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন| রয়েছেন আরও নানা কাজের সাথে জড়িত| তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েই এই লেখা”