মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
গত সংখ্যার পর
আমাদের দেশে মানবসম্পদের যে দৈনদশা তার মূল কারণ এখানে শ্রম মন্ত্রণালয় আছে। কিন্তু, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় নেই। দুটি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি দুই রকম। শ্রম মন্ত্রণালয় সাধারণত নিচের স্তরের কাজের প্রতি মনোনিবেশ করে। দেশের শ্রমিক শ্রেণি নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। শ্রমিকদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। আমাদের দেশে এই প্রবনতা আরও বেশি। ফলে দেখা যায় এই মন্ত্রণালয় বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করে। দেশের গামের্ন্টস শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। এই মন্ত্রণালয়ের চিন্তাভাবনাগুলো ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এই মন্ত্রণালয় সারা দেশের মানবসম্পদ নিয়ে চিন্তা করে। এদের চিন্তা থাকে ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিনিয়ত চিন্তা করে মানবসম্পদকে কিভাবে ভালো থেকে আরও ভালো করা যায়। কিভাবে মানবসম্পদকে দক্ষ থেকে আরও দক্ষ করা যায়। কিভাবে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরি করা যায়। কিভাবে সকল শ্রেণির পেশাজীবি মানুষকে পূর্ণ সম্পদে পরিণত করা যায়। এ ধরনের মন্ত্রনালয় উন্নত দেশগুলোতে আছে। এমনকি ভারত, মালদ্বীপেও আছে। অথচ আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে যদি এ ধরনের কোনো মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে মানবসম্পদের গুরুত্ব আরও বাড়বে। মন্ত্রণালয় মানবসম্পদ উন্নয়নে নানা রকম চিন্তা করার সুযোগ পাবে। দেশের সকল শ্রেণির মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ পাবে। বিভিন্ন পেশার লোকদের শুধু উন্নয়ন নয়, তাদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও এই মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমাদের দেশে নির্বাহীদের কর্মস্থল পরিবর্তনের প্রবনতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছিলাম একসময় মেধাবীদের আগ্রহ ছিল সরকারি চাকরির প্রতি। এরপর এই আগ্রহ বৃদ্ধি পায় ব্যাংকের প্রতি। দেশে টেলকো সেক্টরের উত্থান একসময় মেধাবীদের টেনে নিয়েছে। আকর্ষণীয় বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা এক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। নতুন কোনো সম্ভাবনাময় সেক্টর দেখলে সেদিকে ছুটে চলে যাচ্ছে। ফলে যোগ্য ও দক্ষ নির্বাহীদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এ অবস্থাকে দিনদিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশে মানবসম্পদ উন্নয়নে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা থাকলে এ ধরনের অবস্থা তৈরি হতো না।
বিশ্ব অর্থনীতি নানাবিধ চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে ব্যবসায় মুনাফার পরিমাণ বাড়ছে না, বরং কমছে। এ অবস্থায় ব্যয় কমানো প্রতিষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। এটি আমাদের কাম্য নয়। এ অবস্থা আমাদের মানবসম্পদের জন্য হুমকিস্বরুপ। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য বিকল্প পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কারণ ছাঁটাই কোনো সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ নয়। বরং মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটলে প্রতিষ্ঠানের উপাদনশীলতা বাড়বে, মুনাফা বাড়বে। প্রতিষ্ঠান সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাবে।
আমাদের দেশে মানবসম্পদের ধরন দিনদিন বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় এই পরিবর্তন বেশ লক্ষণীয়। একসময় এ অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে পড়ালেখার চর্চা কম হতো। এখন সেদিন আর নেই। সকলের মধ্যেই পড়ালেখার চর্চা আছে। তবে পড়ালেখার মান নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। এ ধারাও আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়নে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। কারণ পড়ালেখা জানা না থাকলে তাঁদের নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না। এই পশ্চাৎপদতারও মূল কারণ আমাদের দেশে মানবসম্পদ নিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজ করার কোনো মন্ত্রণালয় নেই। পড়ালেখায় মেয়েরা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারীদের ক্ষমতায়ন করা হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক। তবে মানবসম্পদ উন্নয়নের দৃষ্টিকোন থেকে তা যথেষ্ট নয়।
একসময় উচ্চপদে যাওয়ার জন্য যোগ্যতা ও বয়সকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হতো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা না থাকলে বড় পদে যাওয়ার সুযোগ হতো না। এখন চিন্তাভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। যোগ্যতা থাকলে বয়সকে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কর্পোরেট জগতে বয়সে তরুণ অনেক কর্মকর্তা এখন বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন। এদের মধ্যে অনেকে বেশ ভালো করছেন। তরুণরা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখছেন। হয়তো এদের হাত ধরেই বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে যাবে। প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের কদর প্রতিষ্ঠানগুলোতে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশে বিজ্ঞান পড়ার শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসছে। এ অবস্থা দীর্ঘমেয়াদের জন্য ভালো নয়। একসময় বিজ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদের তীব্র সংকট তৈরি হবে। একটি দেশ শুধু ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীদের ওপর ভর করে বেশিদূর এগোতে পারে না। দেশে বিজ্ঞান চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। বিজ্ঞান পড়ার প্রতি মেধাবীদের আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে অনেক কাজ হচ্ছে। তবে তা আরও বড় পরিসরে হওয়া প্রয়োজন। এই সেক্টরের জন্য মানবসম্পদ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁরা শুধু আমাদের দেশের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য কাজ করতে সক্ষম হবে। দেশের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বয়ে আনার পাশাপাশি সুনামও বয়ে আনতে পারবে। দেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে আইটি এক্সপার্ট দিয়ে, আন্তর্জাতিক মানের নির্বাহী দিয়ে, ক্লিনার আর সুইপার বিদেশে পাঠিয়ে নয়।
(চলবে)