Global Header Bottom
ইংল্যান্ডে সৃজনশীল বইয়ের বাজার

লন্ডন থেকে হুমায়রা নাজিব

ইংল্যান্ডে সৃজনশীল বইয়ের বাজার

ইংল্যান্ডে সৃজনশীল বইয়ের বাজার

ইংল্যান্ড একটি রক্ষণশীল জাতি। এদের মধ্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করার প্রবনতা প্রবল। বাড়ির নক্সা, সরকারি ভবন, গাড়ির ডিজাইন, পড়ালেখার ধরন সব জায়গাতেই এরা এদের ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলতে চায়। ইংল্যান্ডের মানুষ তাঁদের পুরোনো প্রতিটি সংস্কৃতিকে লালন করে। ঐতিহ্যগতভাবেই এদেশের মানুষ বই পড়তে পছন্দ করেন। শেক্সপিয়ার, শেলি, জন মিল্টন এরা তো ইংল্যান্ডেরই সাহিত্য জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। এদেশের মানুষ জাতিগতভাবেই শিল্পসাহিত্যের অনুরাগী। এদেশে শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে বিখ্যাত সকল সাহিত্যিকদের বাড়িগুলো রীতিমতো একেকটি দর্শণীয় স্থানে পরিণত করেছে। দেশ বিদেশের মানুষ পর্যটক হিসেবে এই বাড়িগুলো দেখতে আসেন। কথায় আছে যে দেশে গুণীর কদর নেই, সেই দেশে গুণী জন্মায় না। কথাটি যুগ যুগান্তরের মর্মবাণী। এ কারণে এ দেশে পড়ার প্রতি অন্য ধরনের আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। পার্কে গেলে দেখা যায় ঘন্টার পর ঘন্টা মানুষ বই পড়ছেন। ট্রেনের যাত্রীদের হাতে বই নেই এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। এমনকি দাঁড়ানো অবস্থায়ও মানুষ বই পড়ছেন। বিভিন্ন পাবলিক প্লেসগুলোতে মানুষ বই, কফি আর চায়ের কাপ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করে দিচ্ছেন। মানুষ যদি কোথাও একটু বসার সুযোগ পান তাহলেই দেখা যায় তিনি কোনো না কোনো বইয়ের ভেতরে ডুব দিচ্ছেন।

বই পড়ার প্রতি এই জাতি কতটা সচেতন সেটা আমার জীবনের একটি গল্পের কথা শেয়ার করলেই পাঠকেরা উপলদ্ধি করতে পারবেন। এদেশে একটি শিশু জন্মগ্রহণের পর মিডওয়াইফরা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বাড়িতে এসে শিশুর খোঁজখবর নেন। এই ধারাটি অনেক দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। আমার বেবি যখন একদম ছোট তখন একদিন মিডওয়াইফ বাসায় এসেছেন। তিনি বিভিন্ন খোঁজখবর নেওয়ার পর জানতে চাইলেন আমি আমার বেবিকে কোনো বই দিয়েছি কিনা। তাঁর প্রশ্ন শুনে বললাম, আমার বেবি তো এখনো অনেক ছোট। এখনো তো ওকে বই দেওয়ার সময় হয়নি। তখন তিনি বললেন, এটা তোমার ভুল ধারণা। বাচ্চা ছোট থাকলেও ওর জন্য বই নিয়ে আসতে হবে। ওকে বই দিতে হবে। ওর সামনে বই পড়তে হবে। তখন ও ধীরে ধীরে বুঝতে শিখবে বই পড়ার জিনিস। এটা পড়তে হয়। শিশু যদি বই ছিড়ে ফেলে সমস্যা নেই। কিন্তু বই হাতে না দিলে ও তো বুঝতেই পারবে না এটা যে পড়ার জিনিস। এটা সবাই পড়ে। ফলে এদেশে পরিকল্পিতভাবেই শিশুদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়।

এদেশে পড়ার জন্য প্রচুর লাইব্রেরি রয়েছে। বাংলাদেশে লাইব্রেরি শব্দটা দুটি অর্থে ব্যবহার করা হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পড়ার জন্য লাইব্রেরি ব্যবহার করে। আবার পাবলিক লাইব্রেরি রয়েছে। পাড়া মহল্লায়ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। এছাড়া বাংলাদেশে যে সকল দোকান থেকে বই, খাতা, কাগজ, কলাম বিক্রি করা হয় সেগুলোকেও লাইব্রেরি বলে। কিন্তু ইংল্যান্ডে লাইব্রেরি বলতে শুধুমাত্র বসে পড়ার জায়গাগুলোকে বুঝানো হয়। আর বই বিক্রির জায়গাগুলোকে বুকশপ বলে। এখানে লাইব্রেরিগুলোতে মানুষের আনাগোনা অনেক বেশি। শিশুদের লাইব্রেরি থেকে কার্ড ফ্রি দিয়ে দেওয়া হয় যেন ওরা বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। শিশুদের বিভিন্ন লাইব্রেরি ভিজিট করতে নিয়ে যায়। এই সবকিছু করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। এই জাতি জানে আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ফলে শিশুদের গড়ে তোলার সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারলে জাতি পিছিয়ে পড়বে।

লাইব্রেরি থেকে নানা কিছু শেখানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওখানে বিভিন্ন ধরনের কোর্স রয়েছে। ক্যারিয়ার কোর্স থেকে শুরু করে জীবনের প্রয়োজনে নানা ধরনের কোর্স খুব কম খরচে লাইব্রেরি থেকে করা যায়। টিম ম্যানেজমেন্ট, লিডারশিপ, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, লাইফস্টাইল, ফটোগ্রাফি, এমনকি কেক তৈরি থেকে শুরু করে নানা ধরনের কোর্স করার সুযোগ রয়েছে লাইব্রেরিগুলোতে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন এদেশের মানুষকে বই পড়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়, পদক্ষেপ নেওয়া হয় তখন তো পাঠক তৈরি হবেই। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ, জাতি হিসেবে নিজেদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার বাসনা এবং বহুমাত্রিক জ্ঞান অর্জনের অদম্য নেশা তাঁদের মধ্যে বই পড়াকে জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করতে সহায়তা করেছে। ফলে এদেশে পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও সৃজনশীল বইয়ের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন ধরনের বই বাজারে প্রতিনিয়ত আসছে। অনলাইন, অফলাইন দুই মাধ্যমেই বইগুলো বিক্রি হচ্ছে। প্রকাশকেরা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের বইয়ের তথ্যগুলো প্রচার করছেন।

অনেকের ধারণা তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মানুষ হার্ডকপির বই কিনে পড়বে কিনা। বাস্তবতা হলো সাহিত্য হার্ডকপি থেকে পড়ে যে অনুভূতি পাওয়া যায় সেটা সফটকপিতে কখনো পাওয়া যায় না। এটা এদেশের মানুষ খুব ভালোকরেই জানে। এ কারণে এখানে বইয়ের হার্ডকপিও প্রচুর বিক্রি হয়।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer