লন্ডন থেকে
যুক্তরাজ্য: পড়ালেখার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা অর্জন জরুরী
আমার পড়ালেখা বাংলাদেশে। ক্লাশ ওয়ান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি পর্যন্ত। মাষ্টার্স করেছি। পরে এমবিএ। দীর্ঘ এই শিক্ষাজীবনে শুধু পড়েছি। আমি একা নই। বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থীকে এই ধারাই অনুসরণ করতে হয়। বিষয়টি অনেকটা এরকম আগে পড়ালেখা শেষ কর, তারপর চাকরির চেষ্টা কর। ফলে দেখা যায় একজন শিক্ষার্থী যখন পড়ালেখা শেষ করে কর্মজীবনে যায় তখন তাঁর কাছে কর্মজীবনের সবকিছুই নতুন মনে হয়। তাঁকে সবকিছুই শিখিয়ে নিতে হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচার সম্পর্কেও তাঁর কোনো ধারণা থাকে না। প্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো বিষয়গুলো পর্যন্ত হাতে ধরে শেখাতে হয়। এছাড়া শিক্ষাজীবনের মুক্ত বিহঙ্গের মতো জীবন থেকে হঠাৎ শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মজীবনে প্রবেশ অনেকের কাছে বন্দীশালার মতোও মনে হয়। বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলে যুক্তরাজ্যের পড়াশোনার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি কাজের অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন শিক্ষার্থী পড়ালেখার পাশাপাশি কতটুকু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই ইন্টার্নী করার মতো কাজের ব্যবস্থা করা হয়। আবার কেউ ইচ্ছে করলে অন্তত জিসিএসই পাশ করে পুরোদমে কর্মজীবন শুরু করতে পারে। পরে কখনো প্রয়োজন মনে করলে আবারো শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারে।
যুক্তরাজ্যে একটি ছেলে বা মেয়ে ১৬ বছর হলেই সরকার থেকে ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স বা এনআই কার্ড পায়। এটি সরকার থেকে ওই ছেলে বা মেয়ের বাসার ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কাউকে আবেদনও করতে হয় না। সরকারের কাছে যুক্তরাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের পূর্ণ ডাটাবেজ রয়েছে। ওই ডাটাবেজ থেকে সরকার প্রত্যেক নাগরিকের সকল তথ্য-উপাত্ত জানতে পারছে। এই এনআই কার্ড পাওয়া মানেই হলো এখন থেকে তিনি কাজ করার জন্য যোগ্য। বাংলাদেশে একজন ছেলে বা মেয়ে যেমন এইচএসসি পাশ করে ঠিক তেমনি যুক্তরাজ্যে একজন ছেলে বা মেয়ে জেনারেল সার্টিফিকেট অব সেকেন্ডারী এডুকেশন বা জিসিএসই পাশ করে। এরপর থেকেই সকল ছেলেমেয়ে কাজ করার এবং কাজ পাওয়ার অধিকার রাখে। ফলে দেখা যায় একজন ছেলে বা মেয়ে জিসিএসই পাশ করেই কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চলে যাচ্ছে। কাজ করার সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থী সাধারণত ওদের পঠিত বিষয়ের সাথে মিল রেখে কাজ বাছাই করার চেষ্টা করে। যেমন যে শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করছে সে হয়তো এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে যাচ্ছে যেখানে ওর পড়ালেখার সাথে কাজের মিল খুঁজে পাবে। যেমন, কেউ হয়তো ফিজিক্স এ খুব ভালো। ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করছে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আবার কম্পিউটার সায়েন্স এর সাথে ফিজিক্স এর যোগসূত্র রয়েছে। ফলে ওই শিক্ষার্থী যখন এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যাচ্ছে তখন ওর পড়ার বিষয়গুলোর সাথে বাস্তবের কাজের মিল খুঁজে পাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী ইচ্ছে করলে বছরের পর বছরও কাজ করতে পারে। আবার যখন ওই শিক্ষার্থী মনে করবে তাঁর আরও পড়ালেখা করা প্রয়োজন তখন সে আবারো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরবর্তী ক্লাশে ভর্তি হবে। আবার কেউ হয়তো অল্প কিছুদিন চাকরি করার পর আবার পড়ার জগতে ফিরে আসছে। মোদ্দাকথা হলো এখানে লাগাতারভাবে শুধু পড়ে যাওয়াই শেষ কথা নয়। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করবে, পাশাপাশি কাজ করবে, অর্থাৎ পড়বে এবং কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এভাবেই এখানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগামী দিনের জন্য গড়ে তোলে।
আমাদের দেশে যেমন মাষ্টার্স বা এমবিএ করার পর ইন্টার্নী করতে হয়, এখানে জিসিএসই করার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নীর মতো কাজ করতে হয়। যে যত পড়ালেখা করবে তাঁকে তত বেশি পরিমাণে কাজ করতে হবে। ফলে পড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার ভান্ডারটিও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। এ কারণে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করে তখন তাঁর নিকট থেকে প্রতিষ্ঠান যেমন অনেক বেশি সেবা পায়, ঠিক তেমনি তাঁর পক্ষে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করাও সহজসাধ্য হয়। এদেশে অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যাঁরা শুধু জিসিএসই পাশ করেই কর্মজীবনে প্রবেশ করছে এবং বেশ ভালো করছে। পরবর্তীতে জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে হয়তো চিন্তা করছে আরও কোনো ডিগ্রি নেওয়ার। তখন আবারও তিনি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছেন। এই ডিগ্রিটা হয়তো তিনি নিচ্ছেন তাঁর কোনো প্রমোশন পাওয়ার জন্য, অথবা নিজের মনের সন্তুষ্টির জন্য।