ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং
পর্ব- ১৯
একটি প্রোডাক্ট এবং আইকনিক ব্র্যান্ডের মধ্যে পার্থক্য
একটি প্রোডাক্ট তৈরি হয় ফ্যাক্টরিতে। অন্যদিকে একটি আইকনিক ব্র্যান্ড দীর্ঘমেয়াদে বিশ^াস এবং আস্থার সাথে মানুষের মনে তৈরি হয়। একটি প্রোডাক্ট যেকোনো কিছু দিয়ে তৈরি হতে পারে যার বিভিন্ন ধরনের ফিচার থাকতে পারে। একটি আইকনিক ব্র্যান্ড তার নিজস্ব পারসোনালিটির মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করে। একটি প্রোডাক্ট যেকোনো মানুষের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে। একটি আইকনিক ব্র্যান্ড বিক্রি করার জন্য সুনির্দিষ্ট কাস্টমার থাকে। একটি প্রোডাক্ট যেকোনো প্রতিযোগী কোম্পানি যেকোনো সময় নকল করে তৈরি করতে পারে। একটি আইকনিক ব্র্যান্ডের অনন্য কিছু বৈশিষ্ট থাকবে যা খুব সহজে নকল করা যায় না। একটি প্রোডাক্ট যেকোনো সময় গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারে। একটি আইকনিক ব্র্যান্ড সবসময়ই অনন্য বৈশিষ্টের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে চলে। যেকোনো পণ্যকে প্রোডাক্ট বলা যেতে পারে। একটি আইকনিক ব্র্যান্ডের বিশেষ ভ্যালু থাকে। একটি আইকনিক ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য ইউনিকনেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর ইউনিকনেস ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের শক্তি হিসেবে কাজ করে।
ব্র্যান্ড ইউনিকনেস
একটি আইকনিক ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য ব্র্যান্ডের ইউনিকনেস জানাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ব্র্যান্ডটি কেন টিকে আছে? আপনার ব্র্যান্ডের মূল শক্তি কী? কেন আপনার ব্র্যান্ড সবার কাছে গ্রহণযোগ্য? আইকনিক ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য ইউনিকনেস বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী মার্কেটে নীড অ্যানালাইসিস এবং রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে একটি ব্র্যান্ডের ইউনিকনেস তৈরি করা সম্ভব।
থিংক ডিফারেন্ট
গতানুগতিক ব্র্যান্ড ফিচারস এর বাইরে এসে একটি ব্র্যান্ডের ইউনিক ফিচারস ডেভেলপমেন্টের ভিন্নধর্মী চিন্তা-ভাবনা করা খুব জরুরি। যেকোনো ব্র্যান্ডের ইউনিক ফিচারস এর কারণে কাস্টমারদের মনে ব্র্যান্ড সম্পর্কে নতুন ধারণার সৃষ্টি হয়। কাস্টমাররা সবসময় যেকোনো ব্র্যান্ডের নতুন ব্যতিক্রমধর্মী ফিচারসকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
ক্রিয়েটিভিটি
যেকোনো ব্র্যান্ডের লোগো, লেবেলিং, প্যাকেজিং ডিজাইন, ক্রিয়েটিভ অ্যাড, ক্রিয়েটিভ ক্যাম্পেইন, ক্রিয়েটিভ ব্র্যান্ড প্রমোশন ইত্যাদি ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে ক্রিয়েটিভিটির জন্য সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্ধ করে সেরা আইডিয়ার অনুসন্ধান করা উচিত। মার্কেটে অনেক ব্র্যান্ডের মধ্যেই কোয়ালিটি, ইনোভেশন এবং এক্সিলেন্ট সার্ভিস বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু ক্রিয়েটিভ ব্র্যান্ডের সংখ্যা খুবই সীমিত। একটি ক্রিয়েটিভ ব্র্যান্ড সবসময় ক্রিয়েটিভিটির কারণে নিজেকে অন্য সকল ব্র্যান্ড থেকে পৃথক করতে পারে। ক্রিয়েটিভিটির জন্য সেরা আইডিয়া নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্ট করা উচিত। আইডিয়া জেনারেশনের মাধ্যমে ক্রিয়েটিভিটির সূচনা হয়। সেজন্য বিভিন্ন আইডিয়া সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। মার্কেটে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে বিদ্যমান সকল আইডিয়া অনুসরণ করতে হবে। নতুন নতুন আইডিয়া সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ক্রিয়েটিভিটি বলে। সৃজনশীলতার এই যুগে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ক্যাপিটাল বা মূলধন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয় কিংবা ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাও অনেক ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বর্তমান যুগে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতা। ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতা ছাড়া আমাদের জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই আমাদের উন্নতি হবে না বরং ক্রিয়েটিভিটি ছাড়া আমরা একই ধরনের কাজ একইভাবে বার বার করতে থাকবো। ক্রিয়েটিভিটির প্রধানত তিনটি উপাদান। এগুলো হলো এক, কপি করা, অর্থাৎ নতুন আইডিয়া কপি করা। দুই, নতুন আইডিয়াকে কিছুটা রূপান্তর করে অন্যরূপে উপস্থাপন করা, এবং তিন, পুরোনো এবং নতুন আইডিয়ার সংমিশ্রণে নতুন কিছুর উদ্ভাবন করা।
আইডিয়া
একটি বিষয়ের একক চিন্তা কিংবা অনেকগুলো বিষয়ের চিন্তাভাবনা থেকে নতুন একটি আইডিয়া বা ধারণার সৃষ্টি হয়। আপনি বাস্তবজীবনে যত বেশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবেন তত বেশি জ্ঞান বিভিন্ন বিষয়ে আপনি অর্জন করবেন। আপনার মস্তিস্কে ধারণ করা বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান থেকেই বিভিন্ন ধরনের আইডিয়া তৈরি হয়। বিভিন্ন বিষয়ে আপনি যত বেশি জানবেন তত বেশি আইডিয়া জেনারেট করতে পারবেন। তবে আপনি কোন বিষয়ে আইডিয়া জেনারেট করবেন সেই বিষয়ে নতুন আইডিয়া জেনারেট করার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ দরকার। একটি সেরা আইডিয়া তৈরির উপায় হচ্ছে অনেকগুলো সেরা আইডিয়া নিয়ে কাজ করা। আপনি যখন অনেকগুলো আইডিয়া নিয়ে কাজ করবেন তখন অনেকগুলো আইডিয়া থেকে নতুন একটি আইডিয়া তৈরি হতে পারে। আপনি যখন উপযুক্ত পরিবেশে নতুন আইডিয়া তৈরির প্রচেষ্টায় থাকবেন তখন আইডিয়া আপনার মস্তিস্কে আসবে, যাবে কিংবা নতুন তৈরি হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য নতুন আইডিয়া সৃষ্টি কাজ করা অতীব জরুরি। একটি সাকসেসফুল ব্র্যান্ড আইডিয়া ইমপ্লিমেন্টেশনের জন্য তিনটি স্টেজে কাজ করতে হবে। এগুলো হলো আইডিয়া জেনারেশন, আইডিয়া সিলেকশান, এবং আইডিয়া ইমপ্লিমেন্টেশন।
ইমাজিনেশন
ইমাজিনেশন নিয়ে আলবার্ট আইনষ্টাইন বলেছেন, ইমাজিনেশন হচ্ছে জ্ঞানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্ঞানের পরিধি হচ্ছে খুব সীমিত। কিন্তু ইমাজিনেশন পুরো পৃথিবীকে বিস্তৃত করে আছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই জ্ঞান নয় বরং বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইমাজিনেশন। রেলফ ওলডো ইমারশন বলেন, ইমাজিনেশন শুধুমাত্র কিছু মানুষের বিশেষ প্রতিভার অংশ নয়, এটি হচ্ছে প্রতিটি মানুষের সুস্বাস্থ্যের একটি অংশ। কল্পনায় অসম্ভবকে পরিবর্তন করে বাস্তবে পরিণত করার সক্ষমতা অর্জন করাই হচ্ছে ইমাজিনেশন। ইমাজিনেশন হচ্ছে একটি বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। ইমাজিনেশন মানে সমস্যার সমাধান করা নয়, সমাধান খোঁজা নয় কিংবা শুধুমাত্র চিন্তাভাবনা করা নয়। ইমাজিনেশনের মাধ্যমে নতুন নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয় যা কেউ কোনো দিন চিন্তা করতে পারেনি কিংবা যা বাস্তবে অসম্ভব মনে করা হয়। সব সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ইমাজিনেশন। ইমাজিনেশন থেকে ক্রিয়েশন হয়। নতুন কিছু ক্রিয়েশন করতে গেলে সর্বপ্রথম প্রবলেম সামনে এসে দাঁড়ায়। যেকোনো প্রবলেমকে সঠিকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারলে প্রসিবিলিটি দেখতে পাওয়া যায়। মনে করুণ, ক্রিয়েশনের বামপাশে আছে প্রবলেম এবং ডানপাশে আছে পসিবিলিটিস। এই দু’য়ের মাঝখান থেকেই নতুন কিছু ক্রিয়েট করতে হয়।
ক্রিয়েশন থেকে ইনোভেশনের জন্ম হয়। ইনোভেশন অর্থ হচ্ছে নতুন কিছু উদ্ভাবন, নতুনের প্রবর্তন। ইনোভেশনের একপাশে থাকে ডিজাইন এবং অন্যপাশে থাকে ডেভেলপমেন্ট। সঠিকভাবে ডিজাইন করে সঠিক উপায়ে কাজ করতে পারলে অবশ্যই নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট করা সম্ভব হয়। ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি হয় কিংবা নতুনের প্রবর্তন হয়। নতুন কিছু প্রবর্তনের মাধ্যমে ভ্যালু সৃষ্টি হয়। ভ্যালু পাওয়া যায় প্রোডাক্ট এবং সার্ভিস থেকে। ইনোভেশনের মাধ্যমে নতুন প্রোডাক্ট এবং সার্ভিসে ভ্যালু সৃষ্টি হয়। সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ইমাজিনেশন।
কোনো কিছুর কৌশলগত উন্নয়নের শুরুটা হয় কল্পনা এবং কল্পনা করার বিশেষ প্রতিভা (ইমাজিনেশন) থেকে। আমরা একটি কাল্পনিক জগতে বসবাস করছি। কল্পনা করার বিশেষ প্রতিভা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। ইমাজিনেশন হচ্ছে নতুন ধারণা, নতুন কিছু, নতুন কোনো বিজ্ঞান কিংবা সূত্র যার অস্তিত্ব বর্তমানে নেই এমন কিছু বিশেষভাবে কল্পনা করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একজন মানুষ সফলভাবে বিজনেস শুরু করার জন্য কিংবা বিজনেস পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইমাজিনেশন। কারণ একজন উদ্যোক্তা সম্পূর্ণ বিজনেসকে সার্বিকভাবে ইমাজিনেশনের মাধ্যমে বিশেষভাবে কল্পনা করতে পারেন, ভবিষ্যতে বিজনেসের গতি প্রকৃতিসহ সবকিছু স্বপ্নের মতো করে কল্পনা করতে পারেন। নতুন যেকোনো সৃষ্টির সূচনা হয় ইমাজিনেশনের মাধ্যমে।
ইমাজিনেশন সম্পর্কে জজ বার্নার্ড শ বলেন, আপনি যা আশা করেন আপনি তা কল্পনা করেন। আপনি সে রকমই হবেন যা আপনি নিজেকে নিয়ে কল্পনা করেন এবং পরিশেষে আপনি যা চাইবেন সেভাবেই নতুন কিছু সৃষ্টি হবে। লিডিং দ্য রিভোল্যুশন বইয়ের লেখক গ্যারি হেমেল বলেন, একটি কোম্পানি তার সমৃদ্ধ ভবিষ্যত তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, কারণ শুধুমাত্র ভবিষ্যতের ব্যর্থতাকে অনুমান করার ব্যর্থতা নয় বরং ভবিষ্যত নিয়ে ইমাজিনেশন করার ব্যর্থতা। ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোতে প্রাঞ্জলতা কিংবা সুস্পষ্টতা নয় বরং তাদের নতুন কিছু করার একান্ত আকাঙ্খা, আগ্রহ এবং সৃজনশীলতার অভাব রয়েছে। পরিশেষে, ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে একটি কথা অবশ্যই বলতে হবে, ব্র্যান্ড তৈরি হয় মূলত কাস্টমারদের কারণে, মার্কেটারদের কারণে নয়।
(সমাপ্ত)
জিএম, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং এশিয়াটিক ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড