পর্ব- ১: রেফারেল রিক্রুটমেন্ট
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায়, সঠিক মানুষ সহযোগী নাকি প্রতিবন্ধকতা?
“রেফারেল রিক্রুটমেন্ট- কানেকটিং ট্যালেন্ট উইথ অপোরচুয়্যনিটি অ্যাট দ্য রাইট টাইম” বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টরে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধুমাত্র কর্মী নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই| আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এখন একটি কৌশলগত বিভাগ, যার প্রধান লক্ষ্য হলো প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর মানবসম্পদ নিশ্চিত করা| একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে সঠিক জনবলকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোও এইচআর বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব|
বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে| প্রযুক্তির অগ্রগতি, ডিজিটাল রূপান্তর, প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার এবং দক্ষ জনবলের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নিয়োগ কার্যক্রমেও এসেছে নতুন ধারা| এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হলো “রেফারেল রিক্রুটমেন্ট” বা রেফারেলভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া| বাংলাদেশে রেফারেল রিক্রুটমেন্ট নতুন কোনো বিষয় নয়| অতীতেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচিতির মাধ্যমে নিয়োগের প্রচলন ছিল| তবে বর্তমান সময়ের রেফারেল রিক্রুটমেন্ট আগের চেয়ে অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ, পেশাদার এবং ফলাফলনির্ভর হয়ে উঠেছে|
একসময় আমাদের দেশে রেফারেলভিত্তিক সিভিগুলো মূলত ব্যক্তিগত পরিচিতির ওপর নির্ভর করে আসত| অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী কাজের জন্য কতটা দক্ষ, প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় অথবা নির্দিষ্ট পদের জন্য কতটা উপযুক্ত এসব বিষয় তেমন গুরুত্ব পেত না| পরিচিত কাউকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়াই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে করপোরেট সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়েছে| এখন প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পারছে, শুধুমাত্র পরিচিতি নয়; বরং যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই সফল নিয়োগের মূল চাবিকাঠি| বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, টেলিকম, আইটি প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস শিল্প, এনজিও এবং স্টার্টআপ সবখানেই রেফারেল রিক্রুটমেন্ট প্রসেস এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে| কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উপলব্ধি করছে, শুধুমাত্র সিভি দেখে একজন কর্মীর প্রকৃত যোগ্যতা নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়| প্রয়োজন এমন মানুষ, যাঁরা দক্ষতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে, দলগতভাবে কাজ করতে পারবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে|
রেফারেল রিক্রুটমেন্ট কী?
রেফারেল রিক্রুটমেন্ট হলো এমন একটি নিয়োগ পদ্ধতি যেখানে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্মীরা তাঁদের পরিচিত দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের চাকরির জন্য সুপারিশ করেন| অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের এইচআর বিভাগের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন| এই পদ্ধতির মূল দর্শন হলো একজন কর্মী সাধারণত এমন কাউকেই সুপারিশ করবেন যাঁকে তিনি পেশাগতভাবে দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন| ফলে প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে সম্ভাবনাময় প্রার্থী খুঁজে পায়| বাংলাদেশের চাকরির বাজারে বর্তমানে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র| প্রতিদিন হাজার হাজার আবেদন জমা পড়লেও সঠিক দক্ষতার কর্মী খুঁজে পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে| বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষতাভিত্তিক চাকরিতে যোগ্য জনবল খুঁজে পাওয়া এখন অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে| এই বাস্তবতায় রেফারেল রিক্রুটমেন্ট একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী সমাধান হিসেবে কাজ করছে|
রাইট পিপল ইন রাইট প্লেস অ্যাট রাইট টাইম
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বহুল আলোচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “রাইট পিপল ইন রাইট প্লেস অ্যাট রাইট টাইম” অর্থাৎ, সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্বে নিয়োগ দিতে পারাই একটি সফল এইচআর ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য| রেফারেল রিক্রুটমেন্ট এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানে জরুরি ভিত্তিতে একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন| প্রচলিত নিয়োগ পদ্ধতিতে চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া, সিভি যাচাই, শর্টলিস্ট তৈরি এবং একাধিক ইন্টারভিউ নিতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে| কিন্তু প্রতিষ্ঠানের একজন বর্তমান কর্মী যদি আগে থেকেই পরিচিত দক্ষ কাউকে সুপারিশ করেন, তাহলে এইচআর বিভাগ দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে| ফলে প্রতিষ্ঠান যেমন সময় বাঁচায়, তেমনি দ্রুত সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্বে নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়| এটি শুধু নিয়োগের গতি বাড়ায় না, বরং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে সহায়তা করে|
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় সাশ্রয়
রেফারেল রিক্রুটমেন্টের অন্যতম বড় সুবিধা হলো সময় ও খরচ সাশ্রয়| প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সাধারণত চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ, বিভিন্ন জব পোর্টালে পোস্টিং, শত শত সিভি যাচাই, লিখিত পরীক্ষা, একাধিক সাক্ষাৎকার এবং ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের জন্য উল্লেখযোগ্য সময় ও অর্থ ব্যয় হয়| অনেক বড় প্রতিষ্ঠান আবার হেডহান্টিং বা রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির সাহায্যও নেয়, যা নিয়োগ ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়| অন্যদিকে রেফারেল পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান সরাসরি একটি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী পেয়ে যায়| ফলে নিয়োগের সময় কমে আসে এবং এইচআর বিভাগের প্রশাসনিক চাপও হ্রাস পায়| বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান সফল রেফারেলের জন্য কর্মীদের “রেফারেল বোনাস” বা বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করে| অর্থাৎ, কোনো কর্মীর সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় সফলভাবে কাজ করলে সুপারিশকারী কর্মী আর্থিক পুরস্কার পান| এটি কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক উৎসাহ সৃষ্টি করে এবং দক্ষ জনবল খুঁজে আনতে সহায়তা করে|
কর্মীদের নেটওয়ার্কিং এবং বিশ্বাসযোগ্যতা
বাংলাদেশের সামাজিক ও করপোরেট সংস্কৃতিতে সম্পর্ক ও নেটওয়ার্কিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়| অনেক ক্ষেত্রেই পেশাগত সম্পর্ক একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ জনবল খুঁজে পাওয়ার বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়| একজন কর্মী যখন কাউকে রেফার করেন, তখন সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাও জড়িত থাকে| তাই সাধারণত কর্মীরা এমন কাউকেই সুপারিশ করেন যিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবেন বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন| এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান রেফারেল প্রার্থীদের প্রতি প্রাথমিকভাবে বেশি আস্থা রাখে| কারণ তারা মনে করে, পরিচিত এবং যাচাইকৃত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভালো কর্মী পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি| বিশেষ করে আইটি, টেলিকম এবং স্টার্টআপ খাতে এই প্রবণতা আরও বেশি দেখা যায়| এসব খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি এবং নিয়োগের গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| তাই রেফারেল নিয়োগ এখানে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে|
নতুন কর্মীদের দ্রুত অভিযোজন
রেফারেলের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের অন্যতম বড় সুবিধা হলো তাঁরা দ্রুত প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন| কারণ তাঁরা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন, সংস্কৃতি এবং প্রত্যাশা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন| পরিচিত সহকর্মীর মাধ্যমে তাঁরা কর্মপরিবেশের বাস্তব চিত্রও জানতে পারেন| ফলে তাঁদের মানসিক প্রস্তুতি ভালো থাকে এবং যোগদানের পর অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়| এতে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং কর্মীদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ে| অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, রেফারেলের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের চাকরিতে স্থায়িত্ব তুলনামূলক বেশি হয়| কারণ তাঁরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানসিক ও সামাজিকভাবে দ্রুত সংযুক্ত হতে পারেন| ডিজিটাল যুগে রেফারেল রিক্রুটমেন্টের বিস্তার বর্তমানে লিংকডইন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চাকরির তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে| ডিজিটাল যুগে রেফারেল রিক্রুটমেন্ট আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠেছে| বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, পেশাজীবী কমিউনিটি এবং অনলাইন গ্রুপগুলো এখন দক্ষ জনবল খুঁজে পাওয়ার বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে| বাংলাদেশে তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং সংস্কৃতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে| ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অনলাইনের মাধ্যমেই রেফারেল প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে| বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো লিংকডইন রেফারেল প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে দ্রুত দক্ষ কর্মী নিয়োগ করছে| স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোও সীমিত বাজেটে কার্যকর নিয়োগের জন্য রেফারেল পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করছে| তবে রেফারেল রিক্রুটমেন্টের এই জনপ্রিয়তার মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে এই পদ্ধতি কি সবসময় নিরপেক্ষ থাকে? পরিচিতির প্রভাব কি কখনো যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়? কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য (ডাইভারসিটি) ও ন্যায়সংগত নিয়োগের ক্ষেত্রে এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে? এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের এইচআর প্র্যাকটিসে রেফারেল রিক্রুটমেন্টের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা থাকবে এই ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্বে|
(চলবে)
অনুভব রহমান বাংলাদেশের করপোরেট ও ফিনটেক খাতের একজন সুপরিচিত এবং অভিজ্ঞ মানবসম্পদ (HR) পেশাদার। তিনি বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নগদ লিমিটেড-এর চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার (CHRO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নগদ-এ যোগদানের পূর্বে তিনি ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL)-এর অর্গানাইজেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাসিটি এনহ্যান্সমেন্ট সেন্টারের প্রধান (Head) হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি এবং কৌশলগত নেতৃত্বের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।