ফ্রি প্রশিক্ষণ, তবুও প্রত্যাশিত ফল নেই, কেন?
দেশে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের চাহিদা মতো কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। একদিকে বেকার এবং আরেকদিকে কর্মী খুঁজে না পাওয়ার বড় কারণ হলো দেশে দক্ষ লোকের প্রচন্ড অভাব। এডিবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সহ সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে বিভিন্ন উপায়ে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য অবিরাম চেষ্টা চলছে। তথাপি দক্ষ কর্মী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ডোনার এজেন্সি থেকে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তা নিয়ে বেকার ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের পথ সুগম করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য উৎসাহিত করছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বেকারের সংখ্যা যেই তিমিরে ছিল সেখানে থেমে থাকলেও হতো, কিন্তু দিনে দিনে এই তালিকা দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
কেন প্রশিক্ষণ কাজে আসছে না?
আমার কর্মজীবনের অনেকটা সময় কেটেছে মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে। বিশেষ করে ট্রেনিং প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করার অনেক বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। এই ট্রেনিং প্রোগ্রামের অনেকগুলো ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি। শুধু ফ্রি ট্রেনিং নয়, বরং যাঁরা ট্রেনিং নিতে এসেছে তাঁদের ভাতাও দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে যাঁরা ট্রেনিং নিতে এসেছে তাঁদের অনেকের জীবনে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছিল না। অনেকে ট্রেনিং নিয়েছে শুধু ভাতা পাওয়ার জন্য। তাঁদের ভাবনাটা এমন ছিল, বেকার অবস্থায় যা পাওয়া যায় সেটাই লাভ। কিন্তু ওই ট্রেনিং নিয়ে নিজেকে যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়বে এমন মনোভাব খুব বেশি প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে এমন মনোভাব খুঁজে না পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে এদের ফাউন্ডেশন বা শিক্ষার ভিত্তিটাই খুব দুর্বল। আমরা যদি এদের প্রাইমারী এডুকেশনের কথা বিবেচনা করি তাহলে দেখা যাবে ওই স্তরে এদের যে ধরনের পড়ালেখা করা উচিত ছিল সেটা হয়নি। না হওয়ার পেছনে নানা কারণ কাজ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এরা মানসম্পন্ন শিক্ষা পায়নি। ফলে এদের ভিত্তিটাই দুর্বল। এরা বয়সে বড় হলেও দুর্বল ভিত্তির কারণে চিন্তাশক্তি বাড়েনি। এদের ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা, ক্যারিয়ার গড়ার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই দুর্বল। ফলে এরা বুঝতে পারে না এই প্রশিক্ষণগুলো কিভাবে তাঁদের জীবন বদলে দিতে পারে।
যাঁরা প্রশিক্ষণ নিতে আসে তাঁদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এদের মধ্যে অধিকাংশই বহুমাত্রিক লক্ষ্য নিয়ে জীবনে এগোতে চায়। যেমন একদিকে হয়তো ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আবার অন্যদিকে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করছে। সেখানেও কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। বিসিএস, সরকারি প্রাইমারী স্কুল, এমনকি অফিস সহকারী পদেও আবেদন করছে। এদের মধ্যে অনেকে আবার মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দিকে দৌঁড়ঝাপ দেওয়ার প্রবনতার কারণে প্রশিক্ষণ শেষে ভালো কোনো ফল বয়ে আনতে পারছে না। আরেকটি বড় সমস্যা হলো যাঁরা বেকার তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই সর্ট-কাট পদ্ধতিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অথচ তাঁরা এটা বুঝতে চায় না অথবা বুঝতে পারে না জীবনে সর্ট-কাট বলে কিছু নেই। নিজেকে বড় করতে হলে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই এগিয়ে যেতে হবে।
ভালো ফল পেতে হলে
প্রশিক্ষণ থেকে ভালো ফল পেতে হলে আমাদের কারিগরি শিক্ষার সিলেবাস, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সহ প্রতিটি জায়গায় ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশে অনেকগুলো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এগুলোর সিলেবাস এবং প্রশিক্ষণের ধারা এখনো আগের মতোই রয়েছে। শিল্পের চাহিদার সাথে সিলেবাস এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতি মানানসই নয়। ফলে অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়েও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। প্রশিক্ষণ নিয়েও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না এই সংবাদটি যখন বেকারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে তখন প্রশিক্ষণের প্রতি অনেকের মধ্যে অনীহা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া আমাদের দেশে ভালো মানের প্রশিক্ষকের তীব্র অভাব রয়েছে। বিশেষ করে আইটি এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে এই অভাব খুব বেশি।
আমাদের দেশে কোন ধরনের কর্মীর চাহিদা কত এবং বাজারে যোগান কত এর কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেও কোনো সংযোগ নেই। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেউ বুঝতে পারছে না কোন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন এবং কতজনকে দেওয়া প্রয়োজন। এখানে তিন পক্ষের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকা খুব জরুরি। বিশেষকরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র এই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় অধিক প্রয়োজন। আমরা এখানে একটি উদাহরণ টেনে আনতে পারি। ধরা যাক স্পিনিং মিলের কথা। স্পিনিং মিলে তুলা থেকে সুতা তৈরি হয়। ওখানে বড় বড় পদে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করেন। কিন্তু শুধু তাঁদের দিয়ে স্পিনিং মিল চলে না। ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ ছাড়াও সেখানে বিভিন্ন ধরনের টেকনিক্যাল কাজ রয়েছে। ওই কাজের জন্য ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কাজের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র যদি অন্তত দশটি স্পিনিং মিল ঘুরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তাহলে সেখানে একটি তথ্যচিত্র ফুটে উঠবে। ওই তথ্যচিত্র থেকে জানা যাবে একটি স্পিনিং মিলে ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া আর কোন ধরনের টেকনিক্যাল কর্মী প্রয়োজন।
বর্তমানে মিলগুলো ওই কর্মীদের কিভাবে যোগাড় করছে। এ ধরনের কর্মীদের প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার হার কেমন। প্রতিবছর কতজন কর্মী অবসরে যাচ্ছেন। কতজন কর্মী পদোন্নতি পেয়ে ওপরের পদে যাচ্ছেন। শূন্য পদগুলো কিভাবে পূরণ হচ্ছে। কর্মী পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা বেগ পেতে হচ্ছে। অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সহজেই কর্মী পাওয়া যাচ্ছে কিনা। এভাবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো বুঝতে পারবে স্পিনিং মিলগুলোতে যে ধরনের কর্মী প্রয়োজন ওই চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে কর্মী যোগান দেওয়ার কোনো সুযোগ আদৌ আছে কিনা। যদি সুযোগ থাকে তাহলে দেখতে হবে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ওই মানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা আছে কিনা। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো প্রশিক্ষক এবং অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা আছে কিনা। যদি সেটা থাকে তাহলে এবার টার্গেট করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য লোক খুঁজতে হবে। টার্গেট করতে হবে এই জন্য, যাঁকে-তাঁকে প্রশিক্ষণ দিলে সে হয়তো ওই ধরনের কাজের প্রতি পরবর্তীতে আগ্রহী নাও হতে পারে। এ কারণে যাঁরা ওই ধরনের কাজের প্রতি শতভাগ কমিটেড তাঁদেরকে খুঁজে বের করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পূর্বে তাঁদের জন্য একটি ক্যারিয়ার রোড-ম্যাপ তৈরি করতে হবে। এই রোড-ম্যাপ থেকেই তাঁরা জানতে পারবে, বুঝতে পারবে, কিভাবে তাঁদের পদোন্নতি হবে এবং ক্যারিয়ার গড়ে উঠবে।
সংখ্যা নয়, এখন মান প্রয়োজন
সরকারি, বেসরকারি উভয় পর্যায় থেকে সারা দেশব্যাপি ব্যাপক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। এই ধারা অনেক বছর ধরেই চলে আসছে। কিন্তু দেশে বেকারের সংখ্যা কমছে না। বরং দিন দিন বেড়ে চলেছে। প্রতিটি পর্যায় থেকে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে কত হাজার আর কত লাখ বেকার ছেলেমেয়েকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরেও বেকারত্বের গ্লানি থেকে অধিকাংশেরই মুক্তি মিলছে না। এই না মেলার পেছনে প্রশিক্ষণের মান নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে আমি মনে করি এখন আর সংখ্যা নয়, বরং গুণগত মানের প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একইসাথে প্রশিক্ষণের সময়কাল নিয়েও চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এক মাস, দুই মাস, এমনকি তিন মাস নয়। যদি এক, দেড় বা দুই বছর সময়কাল ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় তাহলে শেখার পরিমাণ যেমন বাড়বে, ঠিক তেমনি যাঁরা প্রশিক্ষণ নেবেন তাঁদের আত্ম-বিশ^াসও তৈরি হবে। এদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোও লাভবান হবে। এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার এখনই সময়।
ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইনোভেশনস ইউসেপ